নিজের আয়, রাজনৈতিক দলের অনুদান, আত্মীয়-স্বজনের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান এবং জনগণের স্বেচ্ছায় অনুদান (ক্রাউডফান্ডিং)— এই সব উৎস থেকেই প্রার্থীরা নির্বাচনী ব্যয়ের টাকা জোগাড় করতে পারেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধিমালা অনুযায়ী, এসব অর্থ নির্ধারিত ফরমে উল্লেখ করে ব্যয়ের রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
প্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট আসনে সর্বনিম্ন ২৫ লাখ টাকা এবং ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হারে সর্বোচ্চ ব্যয় করতে পারবেন। সে হিসাবে ঢাকা-১৭ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন। ফলে এই আসনে সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা ৩৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭০ টাকা। এখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলনসহ মোট ১০ জন বৈধ প্রার্থী রয়েছেন। চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী কারা থাকবেন, তা ২০ জানুয়ারির পর নির্ধারিত হবে।
মনোনয়নপত্র জমার সময় তারেক রহমান জানিয়েছেন, তিনি কৃষিখাত ও ব্যাংক আমানত থেকে নিজের আয়ের ৩০ লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয়ে ব্যবহার করবেন। বগুড়া-৬ আসনেও তিনি একই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবেন বলে জানিয়েছেন। সেখানে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হিসাবে তার ব্যয়ের সুযোগ রয়েছে ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ৪৩০ টাকা।জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে নিজের ব্যাংক স্থিতি ও আমানত থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। পাশাপাশি সংগঠনের অনুদান হিসেবে নেবেন ২৫ লাখ টাকা। ভোটার অনুপাতে এ আসনে তার সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ৩৫ লাখ ১৭ হাজার ১৮০ টাকা।
এবার বিএনপি ও জামায়াত দুই শতাধিক দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। বিধি অনুযায়ী, প্রার্থীর সংখ্যা ২০০ জনের বেশি হলে একটি দল সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবে।
ক্রাউডফান্ডিংয়ে অর্থ সংগ্রহ
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনে ভোটের ব্যয়ের জন্য ৪৪ লাখ টাকা ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে এবং ১ লাখ টাকা নিজের আয় থেকে সংগ্রহ করছেন। এই আসনে তার সর্বোচ্চ ব্যয়ের সুযোগ ৪৩ লাখ ৯০ হাজার ৭৮০ টাকা।
ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা মনোনয়নপত্রে সম্ভাব্য ব্যয়ের উৎস হিসেবে ‘জনসাধারণ থেকে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ’ উল্লেখ করেছেন। এ আসনে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হিসাবে ব্যয়ের সুযোগ রয়েছে ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার ৬০০ টাকা।
তবে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গড়মিলের কারণে তার মনোনয়ন বাছাইয়ে বাতিল হয়েছে। প্রার্থিতা ফিরে পেতে তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন। ভোটে ফিরতে না পারলে সংগৃহীত ক্রাউডফান্ডিংয়ের অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
ক্রাউডফান্ডিং নিয়ে কী বলছে ইসি?
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নির্বাচনের জন্য ক্রাউডফান্ডিংয়ে ইসির কোনো আপত্তি নেই।
তিনি বলেন, ‘ক্রাউডফান্ডিংয়ের বিষয়ে আইনে আলাদা কোনো বাধা নেই। আমরা দেখবো প্রার্থী নির্ধারিত সীমার বেশি ব্যয় করছেন কি না। আয়ের উৎস তিনি হলফনামায় উল্লেখ করেছেন কি না— সেটাই মূল বিষয়।’
তিনি জানান, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অনুদান নিতে পারে— এ বিষয়টি আরপিওতে উল্লেখ আছে।
ব্যয় রিটার্ন ও শাস্তির বিধান
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, সব প্রার্থী ও দলকে নির্ধারিত সময়ে ব্যয়ের রিটার্ন জমা দিতে হবে। ব্যর্থ হলে বা মিথ্যা তথ্য দিলে জরিমানা ছাড়াও দুই থেকে সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ভোটের পর এক মাস পর্যন্ত ব্যয় বিবরণী জমার সুবিধার্থে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন অফিসের কার্যালয় খোলা থাকবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, ‘ব্যয়ের রিটার্ন জমা দেওয়া হলেও বাস্তব মনিটরিং দুর্বল। এবার নির্বাচন কমিশনের উচিত কঠোরভাবে তদারকি করা।’
এবারের নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সীমিত সংখ্যক বিলবোর্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ রয়েছে। সব ব্যয় নির্ধারিত খাত অনুযায়ী ছকে উল্লেখ করে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
ইসি জানায়, হলফনামা বা ব্যয়ের রিটার্নে অসত্য তথ্য দিলে ভোটের পরেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।