১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করলেও বঙ্গবন্ধু তখনো বন্দি ছিলেন। ফলে বিজয়ের আনন্দ তখনো ছিল অসম্পূর্ণ। অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপ এবং বাঙালি জাতির মুক্তির অদম্য আকাঙ্ক্ষার মুখে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি গভীর রাতে, অর্থাৎ ৮ জানুয়ারি ভোরে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান। সেদিন তাকে বিমানে তুলে দেওয়া হয় এবং সকাল সাড়ে ৬টায় তিনি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছান। পরদিন ৯ জানুয়ারি ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে তিনি দেশের পথে রওনা হন।
১০ জানুয়ারি সকালে বঙ্গবন্ধু দিল্লিতে পৌঁছান। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, মন্ত্রিসভার সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানসহ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তা এবং সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয় উষ্ণ ও সম্মানজনক সংবর্ধনা। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের জনগণ ও নেতৃত্বের প্রতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অকৃপণ সহযোগিতার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি তার এই প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে।
দিল্লি থেকে একই দিন বেলা ১টা ৪১ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পৌঁছান। তেজগাঁও বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয় লাখো মানুষের জনসমুদ্র। স্বাধীনতার পর এই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে কাছে পেয়ে আবেগে ভাসে পুরো জাতি। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আজ আমি আমার মানুষের কাছে ফিরে এসেছি।’
ইতিহাসবিদদের মতে, বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন না হলে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যে একটি কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।