গত দেড় বছরের উচ্চ সুদহার ব্যবসা-বাণিজ্যকে জটিল করে তুলেছে। দেশের বেসরকারি বিনিয়োগে তাই তৈরি হয়েছে স্থবিরতা। কমে গেছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি, যা কিনা দুই দশকের মধ্যে এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
আবার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে গিয়ে কমানো যাচ্ছে না নীতি সুদহার। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ফেলেছে তীব্র সংকটে।
বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তারা বলছেন, জটিল গ্যাঁড়াকলে দেশের অর্থনীতি। উচ্চ সুদহার এবং একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির অনমনীয় সহাবস্থান দেশের অর্থনীতিকে এক জটিল গ্যাঁড়াকলে ফেলে দিয়েছে। এখন উচ্চ সুদহারই অনমনীয় মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে। চড়া সুদ পুঁজিখরচ ও উৎপাদনের ব্যয় বাড়িয়ে শেষতক খরচতাড়িত মূল্যস্ফীতির জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে শিগগিরই মূল্যস্ফীতিতে লাগাম টানা যাবে না বলেও তারা মনে করেন। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, তবে কি মুদ্রানীতির বিদ্যা ভুল হয়ে গেল? তা নয়। তবে কি এখন সুদহার কমিয়ে দিলেই মূল্যস্ফীতি দুর্বল হয়ে পড়বে? সেটিও সত্য নয়। তাহলে কি উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আমাদের ভাগ্যলিখন বলে মেনে নিতে হবে? সেটি আরও সত্য নয়। এখানে বিগত দিনগুলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে, পরিস্থিতি জটিল হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফুর রহমান বলেন, এখন নতুন রাজনৈতিক সরকার শাসন ক্ষমতায়। রাজনৈতিক টানাপোড়নে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি কমে যায়, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সবশেষ হিসেবে, এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গত দুই দশকের তথ্য অনুসারে, বেসরকারি খাতে এত কম প্রবৃদ্ধি আর কখনো দেখা যায়নি। তবে, আশা করছি পরিস্থিতি এখন পাল্টাতে শুরু করবে। আর সুদ হার কীভাবে কমানো যায় সেদিকে মনোযোগ এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের।
উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাংলাদেশের খবরকে টেলিফোনে বলেন, এতো উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করতে সাহস করবে না। কারণ টিকে থাকা সম্ভব নয়। এর ফলে নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দেড় বছরে অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক ক্রম-অবনতিশীল হয়ে পড়েছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার শেষকালে বিদেশি-স্বার্থরক্ষক নানা চুক্তি করে গেছে। বোঝা যাচ্ছিল যে নতুন সরকার শুরুতেই একটা খাদের মধ্যে পড়বে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন না করেই নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে ইউনূস সরকারের উদ্দীপনা শুরু হয়। এটি ছিল অনাগত সরকারের জন্য একটা ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখার কাজ। দেড় বছরে ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ইউনূস তা মোকাবিলা করতে একটি কমিশন পর্যন্ত গঠন করেননি। বেতন বৃদ্ধির যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। কিন্তু সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্নে হতদরিদ্রের অন্নসংস্থান অনেক বেশি জরুরি।
গত দেড় বছরে ৪০০টি কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কাজ হারিয়েছেন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। ২০২৬-এর জানুয়ারি পর্যন্ত আরও কয়েক লাখ বেকার এই কাফেলায় শরিক হয়েছেন। যারা অন্তত চাকরিতে আছেন, তাদের বেতন বৃদ্ধি যেমন প্রয়োজন, তার চেয়েও মানবিকভাবে বেশি জরুরি হচ্ছে ড. ইউনূস জমানায় বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো খোলা এবং চাকরি হারানো মানুষগুলোর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তাদের পরিবারগুলোর খাবার জোটানো ন্যায্যতার প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজস্বের বর্ধমান রক্তহীনতাই অর্থনীতিতে বিরাজিত আরও ১০টি রোগের কারণ। অর্থ খাতে ড. ইউনূস সরকার কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কারে হাত দেয়নি। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মোতাবেক রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরকে শুধু দুই খণ্ড করে দিয়েই ভেবেছে সংস্কার হয়ে গেল। রাজস্ব খাতে চাপে নতুন রাজনৈতিক সরকার।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থা করুণ। ব্যাংক খাতে আজ খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এই দুর্ভোগের মূল কারণ শিল্পপতি ও বণিকদের পুঁজি বিকাশে বড় বড় ঋণের উপস্থিতি। এগুলো সংগ্রহ করার কথা ছিল পুঁজিবাজার থেকে। এর গভীরে রয়েছে একটি দুর্বল পুঁজিবাজার এবং এখানকার কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়া। সবল ইকুয়িটি বাজার গড়ে না ওঠার কারণে পুঁজিবাজারের বিপদ চেপেছে ব্যাংকের ওপর। ওদিকে দুর্বল রাজস্বের কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের থাবা পড়েছে ব্যাংকের ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, উন্মাতাল সরকারি ঋণের পরিস্থিতি। এখানে লাগাম নেই। যা একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিচ্ছে। এ জন্য এখন থেকেই একটি মিতব্যয়ী বাজেটের খসড়া তৈরি করার পরামর্শ ড. জাহিদ হোসেনের। তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ সুদহার বেশি দিন বজায় রাখতে পারবে না।