×
  • প্রকাশিত : ২০২৩-০১-০১
  • ২২ বার পঠিত
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) রোডম্যাপ অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে। ফলে দেশের রাজনীতির হিসাব-নিকাশের জন্য ২০২৩ সাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে ২০১৪ কিংবা ২০১৮ সালের মতো প্রশ্ন যেন না ওঠে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এ জন্য সবার আগে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনকালীন সরকারের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা ফেরানোটা জরুরি।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো বলছে সংবিধান অনুযায়ীই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। অর্থাৎ ভোটের সময় আওয়ামী লীগ সরকারই ক্ষমতায় থাকবে। অন্যদিকে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো বলছে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে তারা পদত্যাগে বাধ্য করবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক আমাদের সময়কে বলেন, ‘রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবা সব কিছু মিলিয়ে দেশ নতুন বছরে আরও এগিয়ে যাবে। এ বছর মানুষের আগ্রহ থাকবে নির্বাচন নিয়ে। মানুষ চায় সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন হোক।’


আরেফিন সিদ্দিক মনে করেন, ‘নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এ জন্য আলাপ-আলোচনা ও সংলাপের দরকার আছে। দেশে একটা আস্থাহীনতার অভাবও আছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। এই আস্থাহীনতার কারণও আছেÑ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ২০০৪ সালে ২১ আগস্টের মতো ঘটনা স্থায়ীভাবে একটা ক্ষত সৃষ্টি করেছে। সেটি কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, সেদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর চেষ্টা অব্যাহত রাখা দরকার। আমি মনে করি, সংবিধান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমাদের প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া দরকার। এটি না হলে সরকারের জন্যও মঙ্গল হবে না, দেশের জন্যও মঙ্গল হবে না। কেন মঙ্গল হবে না, তার প্রমাণ হলো গত দুটি নির্বাচন। এতে সরকারের জনপ্রিয়তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যার কারণে জনসমর্থন নিয়ে নয়; সরকার দেশ পরিচালনা করছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কাঁধে ভর করে। এ ধরনের আরেকটি নির্বাচন করলে সরকারের জনপ্রিয়তা আরও কমবে, বাড়বে না। আন্তর্জাতিকভাবেও সরকার আরও চাপে পড়বে। এতে করে আমাদের রাষ্ট্রের স্বার্থহানি হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীন দলই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। তখন শাসনকার্য পরিচালনা হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে দমনপীড়নের মাধ্যমে। এই দমনপীড়ন শুধু বিরোধী দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে না, সরকারি দলের ক্ষেত্রে যারা দেশে সুশাসন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চান, তাদের বিরুদ্ধেও হবে। অর্থাৎ আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন হলে সরকার, রাষ্ট্র ও সরকারি দল কারও জন্যই ভালো হবে না।’

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য করণীয় সম্পর্কে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ করতে হবে। এটি বিভিন্নভাবে করা যায়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নাকি সর্বদলীয় সরকার, সে সমঝোতা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করা দরকার। এটি রাজনীতিকদেরই ঠিক করতে হবে।’

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে কারও সঙ্গে সংলাপে যাবেন না। নির্বাচন সামনে রেখে দল গোছানো, আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরা, সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা এবং জোটের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের চেষ্টা নিয়ে নতুন বছরে মাঠে নামবেন তারা। এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিষয়টিও মাথায় থাকবে আওয়ামী লীগের।

রাজনীতিতে কোনো সমঝোতার আশা আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আশাবাদী হওয়া দুরূহ আছে। কিন্তু আমি আশা করি, জাতির স্বার্থে আমাদের রাজনীতিবিদদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা একটা সমঝোতায় পৌঁছাবেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করবেন।’

বিএনপিসহ অন্যান্য দলের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের নমনীয় হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমি যতটুকু বুঝি বিএনপি তাদের দলকে চাঙ্গা করার জন্য নানা প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছে, নানাভাবে জোট বৃদ্ধি করেছে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ করছে। এগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের নমনীয় হওয়ার কিছু নেই, আওয়ামী লীগ নমনীয়ই আছে। নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের সাংবিধানিক যে বিধান আছে, সেভাবেই নির্বাচন হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি গত শুক্রবারও বলেছে শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়। এ রকম কোনো দাবির কাছে আওয়ামী লীগ কখনই নতিস্বীকার করেনি, করবে না।’

চৌদ্দ দলের বাইরে যেসব বাম দল আছে, তারা সরকার পতনের আন্দোলনের পক্ষে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ তাদের কীভাবে মোকাবিলা করবে? রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘যেসব দল বামমুখী বা বামপন্থি অথবা যারা প্রগতিশীল রাজনীতি করে, তাদের চৌদ্দ দলের জোটে আনার জন্য চেষ্টা অব্যাহত আছে এবং থাকবে। তারা এলে আমরা খুশি হব। যদি কেউ না এসে অহেতুক চাপ সৃষ্টি করার জন্য কথা বলে, সে ক্ষেত্রে আমাদের বলার কিছু নেই।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আমরা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন দেখেছি; স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দেখেছি। শুধু বিএনপি নয়, ডান, বাম ও মধ্যপন্থিদের বক্তব্য একটিই আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’

ইতোমধ্যে বিএনপি ও সমমনা ৩৩ রাজনৈতিক দল যুগপৎ আন্দোলনে রাজপথে নেমেছে। গয়েশ্বর বলেন, ‘বিরোধী দলগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। তাদের দাবি সংসদ বিলুপ্ত করে সরকারকে পদত্যাগ করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কোথায়, তা মাপার জন্য বেশি দূর যেতে হবে না। রংপুর সিটি করপোরেশনের ভোটের জামানত হারানো ফল দেখলেই বোঝা যায়। অন্যদিকে আমাদের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ সারাদেশে বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার পরও গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় স্মরণকালের মহাসমাবেশ, ৩০ ডিসেম্বর স্মরণকালের গণমিছিল করেছে বিএনপি। দেশের মানুষ এই সরকারকে চায় না, তা আমরা প্রমাণ করেছি।’

নতুন বছরে আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা সম্পর্কে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের উন্নয়ন কর্র্মকাণ্ড তুলে ধরে জনগণের সমর্থন আদায়ে কাজ করা হবে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে নতুন বছরে পথ চলবে আওয়ামী লীগ।’

নতুন বছরে দল গোছানোর কাজে ব্যাপকভাবে মনোনিবেশ করবে আওয়ামী লীগ। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন আমাদের সময়কে বলেন, ‘তৃণমূল সম্মেলন সম্পন্ন হওয়া কমিটিসমূহের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন ও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিসমূহের সম্মেলন সম্পন্ন করা হবে। নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার নামে যেন গ্রুপিং সৃষ্টি না হয়, নজর থাকবে সেদিকেও। জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি তাদের আদর্শিকভাবে উদ্বুদ্ধ করা হবে।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ ২০২৩ সালে অধিক মনোযোগী হবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat