×
  • প্রকাশিত : ২০২২-১২-১৯
  • ৭১ বার পঠিত
মোহাম্মদ মাকসুদুল হাসান ভূঁইয়া রাহুলঃ
হাতে ‘গোল্ডেন বল’ ট্রফিটা নিয়ে মঞ্চে রাখা বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি, হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন, খেলেন আবেগ মেশানো এক চুমু! এই হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের জন্যই যে বড্ড অপেক্ষায় ছিলেন অগণিত ফুটবল ভক্ত! পাশাপাশি ৩৬ বছরের আক্ষেপ শেষ হলো আলবিসেলেস্তেদের, মরুর বুকে রচিত হলো আর্জেন্টাইন রূপকথা! আর এই রূপকথার মহানায়ক লিওনেল মেসি।

ফুটবলের ব্যক্তিগত এমন কোনো তকমা নেই, যা মেসি জেতেন নি! অধরা ছিল শুধু একটা বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালে ফাইনালে উঠেও অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে এসে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল মেসি বাহিনীর, অপেক্ষা বেড়েছিল আর্জেন্টিনার। দেশের হয়ে বড় কোনো ট্রফিই ধরা দিচ্ছিলো না আলবিসেলেস্তেদের হাতে। আবেগ, আক্ষেপে তাঁদের চোখের জল গাল ছুঁয়েছে, বেড়েছে হতাশা!

আগেই অনুমেয় ছিল ২০২২-এ কাতারেই হবে দেশের জার্সি গায়ে মেসির শেষ বিশ্বকাপ। যে মানুষটা ফুটবলকে এত কিছু দিলেন, যাঁর ফুটবল জাদুতে মুগ্ধ ছিল গোটা বিশ্ব, সেই জাদুকরের হাত কি শূন্য থাকবে বিশ্বকাপের বেলায়? নিশ্চয়ই নয়! মেসি দেশের জন্য বিশ্বকাপ জিততে চেয়েছেন আর তাঁর সতীর্থরা জিততে চেয়েছেন মেসির জন্য! মেসি শুধু একজন অধিনায়ক নন, সতীর্থদের কাছে তিনি এক শুদ্ধ আবেগের নাম, খাঁটি ভালোবাসার নাম!

কাতার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই অঘটন, সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হেরে বসেছিল মেসিরা! বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টাইন ফুটবল ভক্তের মনে তখন শঙ্কা যে বিশ্বকাপ থেকেই আবার ছিটকে যায় কিনা আলবিসেলেস্তেরা! এছাড়া সঙ্গেতো ছিলই মেসি সমালোচকদের কড়া সমালোচনা! অবজ্ঞার রব উঠেছিল, ‘কোথায় মেসি, কোথায় মেসি’! কিন্তু হেরেও সেদিন আত্মবিশ্বাসী ছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি সেদিন বার্তা দিয়েছিলেন, তারা যেনো বিশ্বাস রাখেন মেসিদের উপর, কারণ আর্জেন্টিনাকে যারা ভালোবাসেন, তাদের হতাশ হতে দেবেন না লিওনেল মেসিরা।

সৌদির সঙ্গে অপ্রত্যাশিত হারের পর সমর্থকদের দেয়া কথা রেখেছিলেন মেসি বাহিনী। গ্রুপ পর্বের পরবর্তী ম্যাচে মেক্সিকো ও পোল্যান্ডকে পরাজিত করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ষোলোর ঘরে পৌঁছায় তারা। এই রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। সেখানে প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী নেদারল্যান্ডস। খেলার শুরুতে মেসিরা ২-০ তে লিডে থেকেও খেলার মূল সময় শেষে ফলাফল দাঁড়ায় ২-২। খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। আর্জেন্টিনার গোলবারের দেয়াল এমিলিয়ানো মার্টিনেজের অসাধারণ নৈপুণ্যে ৪-৩ গোলের ব্যবধানে জয় পেয়ে সেমিফাইনালে উঠে যায় আলবিসেলেস্তেরা।

সেমিতে আর্জেন্টিনার সামনে তখন কঠিন প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া। তবে বিশ্বজয়ের মিশনে আসা মেসিদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি ২০১৮ বিশ্বকাপের রানার্স আপরা। সেদিন হেসেখেলেই ৩-০ গোলের ব্যবধানে জিতে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে মেসি বাহিনী।

৩৬ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে নতুন ইতিহাস সাজাতে মেসিরা তখন মাত্র এক ম্যাচ দূরে! এই ম্যাচ জিতলেই তৈরি হবে আলবিসেলেস্তেদের রূপকথার গল্প! তবে রূপকথা সৃষ্টি করাতো খুব সহজ কোনো ব্যাপার নয় নিশ্চয়ই! কারণ তাদের সামনে ছিল টুর্নামেন্ট জুড়ে ছন্দে থাকা গত বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। এই দলের তারকা খেলোয়াড় এম্বাপ্পে, গ্রিজম্যানরা বিশ্বের যেকোনো দলকে দুমড়েমুচড়ে দিতে পারে!

কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচা জুড়ে তখন কোটি ফুটবল ভক্তের দৃষ্টি। কে পাচ্ছেন তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ, তরুণ তুর্কি এম্বাপ্পের ফ্রান্স নাকি ফুটবল জাদুকর মেসির আর্জেন্টিনা? খেলার প্রথমার্ধেই গোল পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ২৩ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি থেকে গোল আদায় করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক মেসি। ৩৬ মিনিটের মাথায় ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আলবিসেলেস্তেদের তুরুপের তাস, বড় ম্যাচের তারকা ডি মারিয়া। ২-০ ব্যবধানে শেষ হয় খেলার প্রথমার্ধ।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও ফরাসিদের উপর নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখে মেসিরা। তবে খেলাটা যেহেতু ফাইনাল, তখনো বহু রঙ দেখা বাকি! খেলার প্রায় ৬৫ মিনিটের মাথায় দারুণ ছন্দে থাকা ডি মারিয়াকে মাঠ থেকে তুলে নিলে হঠাৎই খেই হারিয়ে বসে আর্জেন্টিনা! ৭৯ তম মিনিটে এক পেনাল্টি এবং এরপরের মাত্র ৯৭ সেকেন্ডের মাথায় দারুণ শটে খেলায় ২-২ এর সমতা আনেন ফরাসি গোলমেশিন এম্বাপ্পে।

২-০ গোলে এগিয়ে জয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা আর্জেন্টিনার আকাশে তখন দুশ্চিন্তার কালোমেঘ! মূল সময়ের খেলা শেষে অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধও কাটে গোলশূন্য! কে জিতবে, কে হারবে এই দোলাচাল আর আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের সবুজ মাঠে তখন টানটান উত্তেজনা! ১০৯ মিনিটের মাথায় আবারো মেসি ম্যাজিকে গোলের দেখা পায় আর্জেন্টিনা। গ্যালারি আর বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টাইন ভক্তদের মধ্যে তখন আনন্দের ঢেউ! তবে ফাইনালের রোমাঞ্চকর ঘটনার আর কী শেষ আছে! ১১৫ মিনিটের মাথায় আবারো পেলান্টি পেয়ে যায় ফ্রান্স। নিঁখুত জোরালো শটে গোল আর নিজের হ্যাট্রিক আদায় করে নেন উজ্জীবিত এম্বাপ্পে! অতিরিক্ত সময়ের শেষ বাঁশির সুর নিশ্চিত করে খেলার ফলাফল গড়াচ্ছে টাইব্রেকারে।

তবে ফুটবল বিধাতা এবার আর জয়বঞ্চিত করেন নি মেসিদের! টাইব্রেকারে বাজপাখি খ্যাত আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দেখান অসাধারণ দক্ষতা! ফলাফল নির্ধারনী পেনাল্টি শুট আউটে এম্বাপ্পে গোল করতে পারলেও, ফ্রান্সের কিংসলে কোমানের শট ঠেকিয়ে দেন মার্টিনেজ। ফরাসি আরেক খেলোয়াড় চুয়ামিনি বল মারেন গোলবারের বাইরে দিয়ে। আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রথম ৩টি শুটেই গোল আদায় করে নেন লিওনেল মেসি, পাওলো দিবালা ও লিয়েন্দ্রো পারাদেস। গঞ্জালো মন্ট্রিয়েলের চতুর্থ শট ফ্রান্সের গোলবারের জালে জড়াতেই চ্যাম্পিয়নের স্বর্ণালি তালিকায় উঠে যায় আলবিসেলেস্তেদের নাম!

আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের যে মহাকাব্য রচিত হলো, এর কারিগর আছেন আরো একজন, তিনি কোচ লিওনেল স্কালোনি। শান্ত মস্তিষ্কের, বন্ধুপ্রতিম এই মানুষটি ভীষণ যত্নে আগলে রেখেছেন পুরো দলকে, সর্বদা উৎসাহিত করেছেন, ভরসা রেখেছেন তাঁর প্রিয় শিষ্যদের উপর। শিষ্যরাও তাঁকে গুরুদক্ষিণা দিলেন একেবারে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে!

৩৬ বছরের গ্লানি মুছে দিতে টানা ৩৬ ম্যাচের জয় নিয়ে কাতার বিশ্বকাপে এসেছিল আর্জেন্টিনা। প্রথম ম্যাচে হোঁচট খেয়েও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারা। কারণ এই আর্জেন্টিনা দলে একজন ফুটবলের জাদুকর আছেন, যিনি নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে সতীর্থদের প্রাণবন্ত রেখেছেন! ফিফা বিশ্বকাপের এই ২২ তম আসরেতো তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়! বিশ্বকাপের ইতিহাসে গ্রুপ পর্ব, রাউন্ড অব সিক্সটিন, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে গোল করা একমাত্র ফুটবলারের রেকর্ড এখন তাঁর দখলে! তিনি শুধু নিজে গোল করেননি, চোখধাঁধানো সব এসিস্ট করে সতীর্থদের দিয়েও গোল করিয়েছেন! ক্লাব হোক বা জাতীয় দল, ফুটবলের ব্যক্তিগত ও দলীয় অর্জনের সবকিছুই ঠাঁই পেয়েছে সেই জাদুকরের শোকেসে! নিশ্চয়ই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় সমালোচকও বলতে বাধ্য হবেন, মরুর বুকে আর্জেন্টাইন ফুটবলের রূপকথা রচনার মহানায়ক লিওনেল মেসি একজন কিংবদন্তি, মেসিই সর্বকালের সেরা!

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat