×
  • প্রকাশিত : ২০২২-১১-২৪
  • ৩৭ বার পঠিত
রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে অবৈধভাবে পণ্য আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার থামানো যাচ্ছে না।

একটি সংঘবদ্ধ চক্র চলতি বছরে প্রায় ৭টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে বেপজার আমদানির অনুমতিপত্র (আইপি) জালিয়াতির মাধ্যমে উচ্চ শুল্কের মদ-সিগারেট আমদানি করলেও সিন্ডিকেটের মূল হোতারা অধরাই থাকছে।

এ ধরনের ঘটনা ধরা পড়লে সিএন্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে থানায় মামলা দিয়ে দায় সারছে কাস্টমস। মূলত কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যারের সঙ্গে বেপজার ওয়েবসাইটের আন্তঃসংযোগ না থাকার সুযোগ নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। আর এতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করছে কতিপয় দুর্নীতিবাজ কাস্টমস কর্মকর্তা, যা কাস্টমসের তদন্তেই উঠে এসেছে।

২০২০ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা ইপিজেডের হপ ইয়াক গার্মেন্টসের নামে চীন থেকে আনা তৈরি পোশাকের এক্সেসরিজ খালাসের জন্য বিল অব এন্ট্রি জমা দেওয়া হয়। কায়িক পরীক্ষা করে কাস্টমস দেখতে পায়, এক্সেসরিজের পরিবর্তে ৮৫০ কার্টন বিদেশি সিগারেট আনা হয়েছে। এসব সিগারেটের আমদানি মূল্য সাড়ে ৩ কোটি টাকা, যার শুল্ক-কর প্রায় ২১ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে খোঁজ নিয়ে কাস্টমস জানতে পারে, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (বেপজা) আমদানি অনুমতিপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে এসব পণ্য আনা হয়েছে।

এ ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পায় শুল্ক গোয়েন্দা। বিস্তারিত তদন্তে বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। যে সিএন্ডএফ এজেন্ট পণ্য খালাসের জন্য কাস্টমসে কাগজপত্র জমা দিয়েছে, তারা আমদানিকারকের মনোনীত সিএন্ডএফ এজেন্ট নয়। জাল কাগজপত্র বানিয়ে সিএন্ডএফ এজেন্ট পণ্য খালাসের জন্য কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রি জমা দিয়েছিল। এমনকি আমদানিকারকের স্বাক্ষর যাচাই না করেই শিপিং এজেন্ট সিএন্ডএফ এজেন্টকে ডেলিভারি অর্ডার দিয়েছে। আর পণ্য চালান শুল্কায়নে জড়িত কাস্টমস কর্মকর্তারা দলিলাদি যাচাই না করে খালাসের অনুমতি দিয়েছেন।

এ বিষয়ে ১৮ অক্টোবর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো শুল্ক গোয়েন্দার গোপনীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্য চালানের বিল অব লেডিং ও বিল অব এন্ট্রিতে রপ্তানিকারকের নাম এবং ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট এবং সেলস কন্ট্রাক্টে রপ্তানিকারকের নামে মিল না থাকা সত্ত্বেও শুল্কায়ন কর্মকর্তারা শুল্কায়ন করেন। শুল্কায়ন কর্মকর্তারা যথাযথভাবে দলিলাদি পরীক্ষা করলে শুল্কায়ন পর্যায়ে আইপি জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটন করা যেত। এ ঘটনায় ৩ কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়। তারা হলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন, রাজস্ব কর্মকর্তা কাশেম খান ও রাজস্ব কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন। এই ৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ১৩ অক্টোবর শুল্ক গোয়েন্দা চট্টগ্রামের একটি গোডাউন থেকে বন্ড সুবিধায় আনা ১০৭ মেট্রিক টন কাপড় (পলিস্টার ওভেন ফেব্রিক্স) জব্দ করে। এ কাপড় আনা হয় ঢাকা ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান গোল্ডটেক্স গার্মেন্টসের নামে। ঘটনার পর গোল্ডটেক্স গার্মেন্টস থেকে লিখিতভাবে শুল্ক গোয়েন্দাকে জানানো হয়, একটি চক্র বেপজা থেকে তাদের নাম ব্যবহার করে ১২টি আইপি নিয়েছে। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই।

এছাড়া চলতি অর্থবছরে মোট ৭টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করা হয়েছে। কুমিল্লা ইপিজেডের মেসার্স ব্রান্ডিক্স ক্যাজুয়ালওয়ার, মেসার্স এ চেন টেক্সটাইল করপোরেশন, মেসার্স কাদেনা স্পোর্টসওয়্যার, মেসার্স হ্যাশি টাইগার কোং, ঈশ্বরদী ইপিজেডের মেসার্স বিএইচকে টেক্সটাইল, উত্তরা ইপিজেডের ডং জিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানি, মোংলা ইপিজেডের মেসার্স ভিআইপি ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশ নামে আইপি জালিয়াতির মাধ্যমে মদ-বিয়ার আমদানি করা হয়। তারও আগে ঢাকা ইপিজেডের মেসার্স হপ ইয়ার লিমিটেড, মেসার্স টালিসম্যান লিমিটেড, ঈশ্বরদী ইপিজেডের তিয়ানি আউটডোর, মেসার্স নাকানো ইন্টারন্যাশনাল ও ফুজিয়ান এক্সপোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজের নাম ব্যবহার করে একই কায়দার পণ্য আমদানি করা হয়।

গত ২০ নভেম্বর বেপজা থেকে এনবিআরে চিঠি দিয়ে বলা হয়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র আমদানি অনুমতি জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধভাবে পণ্য আমদানির অপচেষ্টায় সক্রিয় রয়েছে। এ ধরনের জালিয়াতির সঙ্গে ইপিজেডের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের বিআইএন লক করা, কোম্পানির বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের এবং আমদানিকৃত পণ্য শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করার কারণে আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ওই চিঠিতে মিথ্যা অভিযোগে কাস্টমসের দাখিল করা মামলা থেকে প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত অব্যাহতি দিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

যে কারণে টার্গেট ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান : ইপিজেডে ৩ ক্যাটাগরির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত, দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘বি’ ক্যাটাগরিভুক্ত এবং সম্পূর্ণ দেশি অথচ শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান ‘সি’ ক্যাটাগরিভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠান পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। যেখানে সাধারণ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকে এলসি বা ব্যাক-টু-ব্যাক খোলার মাধ্যমে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানি করতে হয়। সেখানে ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান শুধু সেলস কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে এলসি ছাড়াই পণ্য আমদানির সুবিধা পেয়ে থাকে। তাছাড়া ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান অনচেসিস ডেলিভারি সুবিধা পেয়ে থাকে। অর্থাৎ আমদানিকৃত পণ্যবোঝাই কনটেইনার কাস্টমস থেকে সরাসরি ট্রাক-লরিতে ডেলিভারির জন্য উঠিয়ে দেওয়া হয়। আর এ কারণে চোরাকারবারিদের নজর এখন ইপিজেডের দিকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানির জন্য চোরাকারবারিরা ইপিজেডের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেছে নেওয়া উদ্বেগজনক। প্রথমত, এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ভুয়া সেলস কন্ট্রাক্ট বানিয়ে যেহেতু পণ্য আমদানি করা হচ্ছে, সেহেতু ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে শতভাগ অর্থ পাচার হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত নজর দেওয়া না হলে দেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শুল্ক গোয়েন্দার ৬ সুপারিশ : গত ৮ নভেম্বর শুল্ক গোয়েন্দা এনবিআরে চিঠি দিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ পন্থায় পণ্য আমদানি রোধে ৬টি সুপারিশ করেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মনোনীত সিএন্ডএফ এজেন্টদের তালিকা করে এর বাইরে যাতে অন্য কোনো সিএন্ডএফ এজেন্ট বিল অব এন্ট্রি নোটিং করতে পারে, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেরা মালামাল খালাস করতে চায় তাদের নামে সেলফ সিএন্ডএফ লাইসেন্স ইস্যু করা। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সঙ্গে বেপজার ওয়েবসাইটের ইন্টারফেস স্থাপন করা যেতে পারে, যাতে এক আইপি ব্যবহার করে একাধিক বিল অব এন্ট্রি নোটিং করা না যায়। যে গেটে কনটেইনার স্ক্যানিং করা হবে, সেই গেট দিয়েই পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে হবে।

ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ইপিজেডের শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে আমদানি নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ পণ্য চালান আমদানি, মানি লন্ডারিং, চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মতো ঘটনা ঘটেছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে। সাধারণত ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান বেপজার আমদানির অনুমতিপত্র বা সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলা বা ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নেই। বিধায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে জাল আইপি তৈরি করে তা অবৈধভাবে আমদানিকৃত পণ্য খালাসে ব্যবহৃত হচ্ছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, বেপজার ওয়েবসাইটের সঙ্গে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যারের আন্তঃসংযোগ (ইন্টারফেস) নেই। বেপজা ইস্যুকৃত আইপি তাদের ওয়েবসাইটে আপলোড করে। কাস্টমস সেটি ম্যানুয়ালি যাচাই করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের আন্তঃসংযোগ থাকায় ভুয়া এলসি বা ইএক্সপি ব্যবহার করে বিল অব এন্ট্রি বা বিল অব এক্সপোর্ট নোটিং করা যায় না। বেপজার সঙ্গে আন্তঃসংযোগ না থাকায় একটি আইপি দিয়ে একাধিক বিল অব এন্ট্রি নোটিং করা সম্ভব। এ ধরনের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু অসাধু চক্র অসাধু সিএন্ডএফ এজেন্টের সহায়তায় ইপিজেডে অবস্থিত শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অবৈধ পন্থায় পণ্য চালান আমদানি করছে এবং খালাস করছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat